কুরবানীর মাসলা-মাসায়েল

0
45

সুপ্রিয়, মুসলিম ভাই ও বোনেরা
প্রতিবছর সামর্থ্যবান মুসলিমগণ ঈদুল আযহার পশু কুরবানী দিয়ে থাকেন। কুরবানীর অত্যাবশ্যকীয় নিয়ম কানুন এবং মাসলা মাসায়েল জানা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শাপলা টিভির পাঠক-পাঠিকাদের জন্য কুরবানীর এ সমস্ত নিয়ম কানুন/মাসলা মাসায়েল সংকলন করেছেন মাওলানা কামারুজ্জামান (দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী)।

যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব-
 জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ ফজরের পর হতে ১২ ই জিলহজ্ব এর সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রাপ্ত বয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক প্রত্যেকটি মুসলমান নর-নারীর নিকট প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সারে ৫২ তোলা রুপা বা তার সম মূল্যের সম্পদ থাকলে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।
 যে ব্যক্তি নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক শুধু তার উপরই কুরবানী ওয়াজিব। পরিবারের অন্য সদস্য এবং না বালেগা সন্তানের উপর কুরবানী ওয়াজিব নহে।

 যে সমস্ত পশু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ হবে না-
১) ঘোড়া, হরিণ, নীলগাভী, বন্যপ্রানী, হাঁস, মুরগী ইত্যাদি। এ সমস্ত প্রাণীদ্বারা কুরবানী করা জায়েজ নেই।
২) যদি কুরবানীর পশু হারিয়ে যায় অত:পর অন্য একটি ক্রয় করে, পুনরায় যদি প্রথমটা পাওয়া যায় তাহলে যাহার উপর কুরবানী ওয়াজিব সে একটি পশু কুরবানী করলেই চলবে। আর যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয় তাকে উভয় পশু কুরবানী করতে হবে।
৩) ঈদের নামাজ আদায়ের পূ্র্বে কুরবানীর পশু জবাই করলে কুরবানীর ওয়াজিব আদায় হবে না।
৪) কুরবানীদাতা অন্য স্থানে থাকলেও কুরবানীর পশু যেখানে আছে সেখানে ঈদের নামাজ আদায়ের পর কুরবানী করা যাবে।

 যে সমস্ত পশু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ
১) ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, মহিষ, গরু ও উট –এ সমস্ত পশু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ।
২) খাসীকৃত পশু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ।

 কুরবানীর পশুর বয়স
১) উটের বয়স কমপক্ষে ৫ বছর হতে হবে। গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এ সমস্ত পশুর বয়স কমপক্ষে ১ বছর হতে হবে।
২) ভেড়া ও দুম্বার ছয়মাস বয়সে যদি এমন মোটা তাজা হয়ে যায় যেটা এক বছর বয়সের পশুর মাঝে ছেড়ে দিলে পার্থক্য করা কঠিন, তাহলে সেই ভেড়া এবং দুম্বা কুরবানী করা যাবে। ছাগলের ক্ষেত্রে এক বছরের কম বয়সে কুরবানী করা যাবে না।
৩) কুরবানীর পশুর যদি উপযুক্ত বয়স হয়ে যায় সেই ক্ষেত্রে দাঁত পরিপূর্ণ না উঠলেও কুরবানী বৈধ হবে।
৪) যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর বয়স পূর্ন হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীর দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং কুরবানী করা যাবে।

 যে সমস্ত ত্রুটি থাকলে কুরবানী করা যাবে না-
১) অন্ধ, কানা এবং লেংড়া এ সমস্ত পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে না।
২) রুগ্ন, এত দূর্বল যে জবেহের স্থান পর্যন্ত পায়ে হেটে যেতে পারবে না এমন পশু দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়।
৩) যে সমস্ত পশুর দাঁত মোটেই নেই অথবা অধিকাংশ নেই এমন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে না।
৪) যে পশুর কান বা লেজ নেই, এক তৃতীয়াংশ এর বেশী অর্থাৎ তিনভাগের এক ভাগের বেশী অংশ কাটা সে পশুর দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়।
৫) শিং মূলসহ উঠে গেলে সে পশুদ্বারা কুরবানী বৈধ নয়।
৬) যদি বকরি, ভেড়া এবং দুম্বার এক স্তন থেকে দুধ না বের হয় তাহলে এগুলি দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়।
৭) কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তি ঋনের টাকা দিয়ে কুরবানী করলেও ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের উপর ঋন নিয়ে কুরবানী করা যাবে না।

 কুরবানীর গোশত বন্টন
১) শরীকে কুরবানী দিলে অনুমান করে গোশত বন্টন করা বৈধ নয়। মেপে বন্টন করতে হবে।
২) কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজে রাখা, এক ভাগ আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীকে দেওয়া এবং এক ভাগ গরীব মিসকীনদের দেওয়া উত্তম।
৩) মান্নতের কুরবানী হলে সমস্ত গোশত সদকা করা ওয়াজিব। তবে ধনী ব্যক্তিদের দেওয়া যাবে না।
৪) কুরবানীর গোশত পারিশ্রমিক হিসেবে যেমন- জবাই কারী, চামড়া ছুলানো, গোশত বানানো ইত্যাদির বিনিময়ে কাউকে গোস্ত দেওয়া যাবে না। পারিশ্রমিক হিসেবে পয়সা দেওয়া বৈধ হবে।

 পশুর যে সমস্ত অংশ খাওয়া জায়েজ নেই-
১) পুরুষাঙ্গ      ২) যোনীপথ     ৩) মূত্রথলি    ৪) গ্রন্থি/টিউমার সাদৃশ্য যা চামড়ার নিচে থাকে।
৫) হারাম মগজ যা মেরুদন্ডের হাড়ের ভিতরে থাকে।    ৬) অন্ডকোষ    ৭) পিত্তথলি    ৮) প্রবাহিত রক্ত ।

 কুরবানীর পশুতে শরীকের বিধান-
১) গরু, মহিষ এবং উটে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি শরীক হতে পারবে।
২) কুরবানীর পশুতে দুই অংশ নিয়ে একটি নিজের নামে অপরটি পিতামাতার নামে দিয়ে ছওয়াব পৌছানো জায়েজ আছে।
৩) গরু, মহিষ এবং উটে দুইজন, তিনজন, চার ও পাঁচ কিংবা ছয় ও সাতজন অংশ নিতে পারবে। তবে মনে রাখতে হবে এক ভাগের চেয়ে কম হতে পারবে না। অর্থাৎ এক অংশ দুইজন ভাগ করে নেওয়া যাবে না।
৪) কুরবানীর পশুকে অংশে ভাগ না করে ক্রয় করা হলে যে কয়জন মিলে ক্রয় করবে তাদের নাম ব্যতিত অন্য কারো নাম দেওয়া যাবে না। আর যদি কুরবানীর পশু এভাবে ভাগ করা হয় যে একজন তিন ভাগ নিবে এবং অন্যজন চার ভাগ নিবে তাহলে যে তিন ভাগ নিবে সে তিনটি নাম দিবে এবং যে চারটি ভাগ নিবে সে চারটি নাম দিবে।
৫) কোন ব্যক্তি যদি গোসত খাওয়া বা লোক দেখানো ইত্যাদি নিয়তে কুরবানী করে। তাকে অংশীদার বানিয়ে কুরবানী করলেও সকল অংশীদারের কুরবানী নষ্ট হয়ে যাবে। তাই শরীক নির্বাচনের সময় খুবই সতর্ক থাকা দরকার।
৬) যদি কুরবানীর শরীক ব্যক্তি কুরবানীর পূর্বেই নিয়ত করে যে কুরবানীর পর গোশত বিক্রি করে দিবে, তাহলে কাহারো কুরবানী আদায় হবে না। কুরবানীর গোশত বিক্রি করে দিলে উক্ত টাকা সদকা করা ওয়াজিব।
৭) যার সমস্ত উপার্জন বা অধিকাংশ উপার্জন হারাম তাকে শরীক করে কুরবানী করলে অন্যান্য সকল শরীকের কুরবানী অশুদ্ধ হয়ে যাবে।

 কুরবানী বিষয়ে প্রচলিত ভ্রান্তিসমূহ:
১) অনেকেই মনে করে থাকেন যার আকিকা করা হয়নি তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নহে। এটা ভূল মতামত, কুরবানী ওয়াজিব।
২) অনেকেই মনে করে ওয়াজিব কুরবানী আদায় না করে এর সমতুল্য সম্পদ গরিব এতিমদের মাঝে বিতরণ করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। এটাও ভূল ধারনা। ওয়াজিব আদায় না করার কারনে গুনাহগার হবে। উচিত হল কুরবানী করে কুরবানীর পশুর চামড়া এবং গোশত গরিবদের মাঝে বিতরন করে দেওয়া।
৩) যার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব, এমন ব্যক্তি কুরবানী না করলে- তার উপরও ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। তাকে ঈদের নামাজ আদায় করা থেকে বাধা দেওয়া যাবে না। তবে কুরবানী না করতে পারলে কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগল ছদকা করে দেওয়া ওয়াজিব।
৫) সাধারনত দেখা যায় কুরবানীর পশু জবাই করার আগে সকল শরীকদের নাম এবং তাদের পিতার নামসহ তালিকা পড়াকে জরুরী মনে করা হয়। ফলে অধিকাংশ জায়গায় কুরবানীর পশুকে শুইয়ে বেধে জবাইয়ের জন্য পূর্ন প্রস্তুত করার পরও জবাই দেরী করা হয়। অথচ জবাইকারী শরীকদের নাম না জেনে জবাই করলেও সকল শরীকদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে।

 কুরবানীর সাথে আকীকা:
আকীকা করা দ্বারা সন্তানের বালা-মুসিবত দূর হয় এবং সন্তান যাবতীয় বিপদ আপদ থেকে নিরাপদ থাকে।
১) ছেলে হলে আকীকায় দুইটি বকরি বা ভেড়া উত্তম। আর মেয়ে হলে একটি বকরি বা ভেড়া কিংবা কুরবানীর গরু ইত্যাদি বড় পশুর মধ্যে ছেলের জন্য দুই অংশ নিতে হবে। আর মেয়ের জন্য এক অংশ।
২) যে সকল পশু দ্বারা কুরবানী বৈধ উক্ত পশু দ্বারা আকীকা করাও বৈধ। গোশত ও চামড়ার ব্যপারে কুরবানী ও আকীকার একই হুকুম।

কুরবানী করার ক্ষেত্রে এ সমস্ত মাসায়েলগুলি অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে। তাহলেই হয়তো কুরবানীর হক আদায় হবে।

LEAVE A REPLY