কে হচ্ছেন জামায়াতের আমীর?

0
332

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ
যুদ্ধাপরাধ ইস্যু এবং সরকারের অব্যাহত দমন পীড়নে রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই কোণঠাসা জামায়াত। মাঠের রাজনীতিতে তারা প্রকাশ্যে কোন তৎপরতা চালাতে না পারলেও আভ্যন্তরীণ সকল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি।

এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতের নতুন আমীর নির্বাচন শুরু হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ায় চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। গত ১৪ অক্টোবর সারাদেশের মজলিসে শুরা সদস্যদের ভোটে তিন জনের আমীর প্যানেল গঠিত হয়। এরপর থেকে অর্থাৎ গত ১৭ অক্টোবর প্যানেল ঘোষনার পর এখন চলছে সাধারণ সদস্যদের ভোট গ্রহণ; চলবে নভেম্বরের ১০ তারিখ পর্যন্ত। সারাদেশের প্রায় ৪৫ হাজার সদস্যদের কাছে প্যানেলের নাম সহ গোপন ব্যালেট পৌছানো হচ্ছে।

শুরা’য় গঠিত প্যানেলের ১ নম্বরে আছেন বর্তমান সেক্রেটারী জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান, ২য় স্থানে আছেন সাবেক এমপি ও নায়েবে আমীর অধ্যাপক মজিবুর রহমান এবং তৃতীয় স্থানে আছেন আরেক নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। ধারনা করা হচ্ছে শফিকুর রহমান এবং অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মধ্যে যে কোন একজন আমীর নির্বাচিত হতে পারেন। তবে এক চিঠিতে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বয়সের ভারে ন্যুজ্ব মকবুল আহমদ অব্যাহতি চাইলে নির্বাহী পরিষদে তা গৃৃহীত হয়।

সাবেক আমীর মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ-এর ফাঁসি কার্যকর হবার পর ডা. শফিক মূলত: দলের ফ্রন্ট লাইনে আসেন। তৎকালীন সময়ে এটিএম আজহারুল ইসলাম গ্রেফতার হবার পর ডা. শফিক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী হন এবং পরে দলের সেক্রেটারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কেন্দ্রের রাজনীতিতে শফিকুর রহমান জুনিয়র এবং সিলেট থেকে কয়েকবছর আগে উঠে আসায় জাতীয়ভাবে তাঁর পরিচিতি কম। তাছাড়া সিলেট শহর ও নিজ এলাকা মৌলভীবাজার থেকে দুইবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে ডা. শফিক শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এবার ঢাকার মীরপুর থেকে জাতীয় নির্বাচনে তিনি অংশ নেন এবং যথারীতি পরাজিত হন। তাছাড়া গত সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াত অংশগ্রহণ করে জামানত হারানোর ঘটনায়ও ডা. শফিককে দায়ী করা হয় এবং এতে দলের মধ্যে তাঁর ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষুন্ন হয়েছে বলে অনেকেই জানিয়েছেন ।

ঢাকার এক নেতা দাবী করেন, ‍”ডা. শফিকুর রহমান জনমূখী নেতা না হলেও আভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দলীয় নেতাদের সাথে তার যোগাযোগ বেশ ভাল। বিগত দিনে দলীয় আমীর মকবুল আহমদ অসুস্থতার ধরুন সর্বদা সক্রিয় থাকতে পারেন নি, রুটিন ওয়ার্ক ছাড়া তাঁর তেমন কাজ ছিলনা। দেশে-বিদেশে ব্যাপক সফর সহ ডা. শফিক জেলা, থানা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। মহিলা বিভাগেও রয়েছে তাঁর নিবিড় তত্বাবধান।”
জামায়াতের সকল পর্যায়ের নির্বাচনে মহিলা রুকনদের ভোট এখন একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিয়েছে। তাছাড়া প্যানেলে যেহেতু তার নামই সর্বাগ্রে এবং মজলিসে শুরা কর্তৃক প্যানেল গঠিত তাই সাধারণ সদস্যরা (রুকন) তাকেই বেছে নিবেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অতীতের রেকর্ডও তাই বলে। সব হিসাব কষলে ডা. শফিকই এবার অনায়াসে আমীর নির্বাচিত হবেন-এটা প্রায় নিশ্চিত।

প্যানেলের ২য় অবস্থানে থাকা অধ্যাপক মজিবুর রহমান দলে একজন সহজ-সরল, নিষ্ঠাবান ও ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে জামায়াতের শ্রমিক সংগঠন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়েছে। তিনি তাঁর এলাকা ও রাজশাহী অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়। সাবেক এমপি ও একসময় জামায়াতের সংসদীয় দলের নেতৃত্ব দেয়ায় জাতীয় পর্যায়ে তার পরিচিতি অন্য দলগুলোর শীর্ষ রাজনীতিবিদদের মতোই বিস্তৃত হয়। জাতীয় রাজনীতিতে রয়েছে তার পোড়খাওয়া অভিজ্ঞতা। বর্তমান আমীর মকবুল আহমদ গ্রেফতার হবার পর তিনি দীর্ঘসময় দলের ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তৃণমূলের এক নেতা জানান, এই মূহুর্তে দলে তিনি সবচাইতে সিনিয়র ও বিতর্কমুক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তাঁর বেশ কয়েকটি সুলিখিত বই আছে যা জামায়াতে সহজবোধ্য দাওয়াতী উপক্রম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দলের বিশাল একটি অংশ আধ্যাত্মিক চেতনা ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের মডেল হিসেবে অধ্যাপক মজিবুর রহমানকে বিবেচনা করেন। এমনটি হলে শেষভাগে তিনিই  আমীর নির্বাচিত হওয়ার প্রবল  সম্ভাবনা রয়েছে।

প্যানেলের অন্য নেতা হিসেবে সাবেক এমপি ও নায়েবে আমীর মিয়া গোলাম পরওয়ার অন্তর্ভূক্ত রয়েছেন। তিনি শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনেরও কেন্দ্রীয় সভাপতি। একজন সুবক্তা এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে সংগঠনে। আমীর পদে তার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে প্যানেলের বাহিরে জেলেবন্দী নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সহ অন্য কাউকে নির্বাচিত করতে পারবেন ভোটাররা; এমনি দলের গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে।

আমীরের পর কে হবেন সেক্রেটারী জেনারেল?

জামায়াতে সেক্রেটারী জেনারেল পদ সংগঠনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ বলে বিবেচিত হয়। এই পদের দাপট এবং ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে বিধায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সারাদেশে সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। প্রয়াত আলী আহসান মুজাহিদের মতো সম্প্রতি ডাঃ শফিকও এই পদে থেকে দেশ-বিদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এবার কে হতে যাচ্ছেন এই গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী? প্রশ্নটি ইতিমধ্যে জামায়াত মহলে বেশ আলোচিত হচ্ছে। দলের আমীর নির্বাচিত হওয়ার পর নির্বাহী পরিষদের পরামর্শে নতুন সেক্রেটারী জেনারেলের নাম ঘোষণা করা হয়। এক্ষেত্রে আমীরের পছন্দই বেশি প্রাধান্য পায়। সেক্ষেত্রে বর্তমানে সহকারী সেক্রেটারী জেনারেলদের মধ্যে সিনিয়র হিসেবে যার নাম অগ্রভাগে, তিনি হলেন এটিএম মাসুম। ডাঃ শফিকুর রহমানের পূর্বে তিনি একবার ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল ছিলেন।

একটি সূত্র জানায়, এটিএম মাসুম মূলত: সাংগঠনিক নেতা হিসেবে পরিচিত; জাতীয় রাজনীতিতে তার পরিচিতি তেমন নেই। তিনি ঢাকা মহানগরের নায়েবে আমীর পদ থেকেই সরাসরি কেন্দ্রে আসেন। মাঠপর্যায়েও তিনি দলের কর্মীদের কাছে তেমন পরিচিতও নন। তার সেক্রেটারী জেনারেল হওয়া প্রধানত আমীরের উপরই নির্ভর করবে।

এরপরে সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে বেশী আলোচিত নাম রফিকুল ইসলাম খান ও ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এরা দুজনই শিবিরের সাবেক সভাপতি। ডা. তাহের দলের নেতা ও কর্মীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। জাতীয় রাজনীতি ও এলাকায় তার বেশ দাপট রয়েছে। তিনি সাবেক এমপি এবং ব্যবসায়ী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সবচাইতে বেশী পরিচিত জামায়াত নেতাদের একজন। নব্বই’র দশকে ইফসু ও ওয়ামীতে নেতৃত্ব দিয়ে তাহের চমক সৃষ্টি করেছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের নির্বাচিত জিএসও ছিলেন তিনি। এসএসসিতে কুমিল্লা বোর্ডে তৃতীয় স্থান পাওয়া অত্যন্ত সুবক্তা ডা. তাহেরকে শিবিরের ইতিহাসে সবচাইতে মেধাবী সভাপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন জামায়াতের আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। জামায়াতের তরুণ প্রজন্ম ডা. তাহেরকে সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে পাওয়ার ব্যপারে বেশ আশাবাদী।

জামায়াতের তরুণ নেতাদের মধ্যে যিনি খুব দ্রুত জাতীয় নেতৃত্বে উঠে এসেছেন তিনি হলেন রফিকুল ইসলাম খান। ঢাকা মহানগরীতে বেশ কয়েক বছর আমীর থাকার কারণে জাতীয় রাজনীতিতে তার পরিচিতি ব্যাপক। রফিকুল ইসলাম খান একই সময়ে ঢাকা মহানগরী আমীর ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন; ফলে দলের মধ্যেও তাঁর অবস্থান বেশ সুসংহত হয়। তবে আইসিটি ট্রাইবুনালে ৬ মাসের সাজাপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে রফিক খান দীর্ঘদিন ফেরারী জীবন যাপন করছেন। এলাকায় তাঁর যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিভিন্ন দিক বিবেচনায় সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে রফিকুল ইসলাম খান এর নামই বেশী আলোচিত হচ্ছে বলে জানা যায়।

এছাড়াও সেক্রেটারী জেনারেল পদে সাবেক এমপি হামিদ হোসাইন আজাদ এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুলেরও নাম আলোচিত হচ্ছে।

জামায়াতের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের সকল কার্যক্রম গঠণতন্ত্র মেনেই পরিচালিত হয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং দায়িত্বশীল মনোয়ন সবকিছুই সংগঠনের ঐতিহ্য এবং নিয়ম শৃঙ্খলা অনুসরণের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সুতরাং জামায়াতের আমীর নির্বাচন সহ গোটা প্রক্রিয়া একটি নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন আমীরের নাম ঘোষণা এবং শপথের ব্যবস্থা করবে দলটির নির্বাচন কমিশন।

LEAVE A REPLY