নোমান মাহমুদঃ

ভ্রমণ কার না ভালো লাগে?
আর সেই ভ্রমণ যদি হয় সাগরের বীচে কিংবা পাহাড়ের গলিতে? তবে কি কেউ বাদ দিবে সেই স্বাদ; তবে কি হাটবে না সাগর পাড়ে কিংবা পাহাড়ের উচু নিচু পথে?

এই দুইয়ের অপরূপ সম্মিলন ঘটেছে কেপটাউনে। প্রকৃতির এই অবারিত সৌন্দর্য যে কোন পর্যটক কিংবা ভ্রমণ পিপাষূদের হৃদয় কাড়বে দক্ষিণ আফ্রিকার এই শহরটিতে।
আর এজন্য বারবার বিশ্বের ১নং পর্যটন শহর হিসেবে কেপটাউন বিশ্বের পর্যটকদের কাছে পছন্দের শীর্ষে রয়েছে।
যেখানে প্রতিবছর ইউরোপ আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশ মহাদেশের ভ্রমণ পিপাসুরা আসেন কেপটাউনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে যখন মানুষ প্রকৃতির অপরীসীম সৌন্দর্য দেখতে কেপটাউন আসে, তখন একই দেশে বসবাস করেও সেখানে যাবার সময় সুযোগ হয়ে উঠেনি বিগত তিন বছরে।
এবার কোন রাখ-ঢাক না করেই সিদ্ধান্ত নেই জানুয়ারীতেই হলিডে কাটাতে কেপটাউন যাবোই।
যেই সিদ্ধান্ত, সেই টিকেট; দীর্ঘ পথ। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান শহর জোহানেসবার্গ থেকে প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই পথ আকাশ ও স্থল উভয় পথেই যাওয়া যায়। বিমান ও স্থল পথে ভাড়ার পার্থক্য খুব বেশি নয়। পিক আওয়ার টাইম না হলে বিমান এবং বাসের টিকেট প্রায় সমান। সময় এবং অর্থ হিসাব করেই বিমানের টিকেট করি।

১১ জানুয়ারী ২০১৯। স্বপ্নের শহর কেপটাউনে উদ্দেশ্যে জোহানেসবার্গ বিমানবন্দরে যেতে দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে দ্রুত গতির মেট্রোরেল ‘ঘাউট্রেন’ ব্যবহার করি। এই ট্রেন অত্যন্ত আরামদায়ক এবং নিয়ম নীতি অনুযায়ী চলে। কার্ড সিস্টেমে টিকেট করতে হয়। ট্রেনটির যাত্রা পথ অত্যন্ত নিরাপদ।
যাই হোক ট্রেনে করে বিমানবন্দরে পৌছাই। বিকালের দিকে বিমানে চড়ে বসি। প্রায় ৩ বছর পর আকাশে উড়াল।
আকাশের মেঘ, নীল-সাদা আকাশের তলদেশ দিয়ে পাখির মতো উড়ে বেড়ানো ভ্রমণ পিপাসুদের মত আমারও হৃদয় দোলে যায়।

প্রায় ২ঘন্টা উড়োজাহাজের ভ্রমন শেষে যখন কেপটাউন বিমান বন্দরে নামবো, তখন বৃষ্টি শুরু হয়। মোবাইলের নেটওয়ার্ক আসার সাথে সাথে প্রিয় ভাই মাছুম আহমদের মেসেজ; বিমান বন্দরের বাইরে সে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষমান। মাছুম আমার পাশের এলাকার এক প্রিয় ভাই; দীর্ঘদিন থেকে কেপটাউন বসবাস করে আসছে।

গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে আমি বিমানবন্দরে বাইরে অপেক্ষমান মাছুমের গাড়িতে চড়ে তার বাসায় পৌছাই। সেখানে গিয়ে দেখা মেলে আমার পার্শ্ববর্তী থানার আবেদুর রহমানের সাথে; পরিচয় পর্বের এক পর্যায়ে নিজের আত্মীয় পরিচয় পাওয়া গেল। দীর্ঘ দিন পর তাদের সাথে দেখা হওয়ায় আমরা খোশ-গল্পে মেতে উঠি।
চলছে খাবার দাবারের প্রস্তুতি। রাতের খাবার খেয়ে আবারো শুরু হয় কথা গল্প। পরদিন কোথায় কোথায় বেড়ানো যায় তার সংক্ষিপ্ত পরিকল্পনাও করি আমরা।
কেপটাউনে দীর্ঘদিন থেকে বসবাস করে আসছেন আমার গ্রামের রনি আহমদ এবং পার্শ্ববতী এলাকার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তারাও ফোনে খবরা খবর নিচ্ছেন। পরদিন সবাই একসাথে বের হওয়ার পরিকল্পনা করে ঘুমিয়ে যাই।

সকালের নাস্তা শেষে রনি এবং আব্দুল্লাহ ভাই মাছুমের দোকানে আসেন। একে অপরকে দীর্ঘদিন পরে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরি। কুশল বিনিময় হয়। এবার গন্তব্য ওয়াটার পয়েন্ট। যেটি নাকি কেপটাউনের সবচেয়ে সৌন্দর্য্যের স্থান। এটিকে কেউ কেউ কেপপয়েন্টও বলেন। অর্থাৎ ওয়াটার পয়েন্ট ও কেপপয়েন্ট একদম পাশাপাশি।

কেপপয়েন্টে আমাদের গাড়ি পৌছালে আমরা পার্কিং খুজতে থাকি। বছরের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি পর্যটক কেপপয়েন্টে আসেন, বিধায় পার্কিং গুলো প্রায় পরিপূর্ণ ছিলো।
গাড়ি থেকে নামতেই দেখি হাজার হাজার পর্যটক। বেশিরভাগ পর্যটক ইউরোপ থেকে এসেছেন বলে মনে হলো। ভ্রমণ পিপাষুদের ভিড়ে ওয়াটার এবং কেপ পয়েন্ট পরিপূর্ণ। কয়েক কদম হাটতেই চোখ পড়ে বেশ কয়েকটি পতাকা উড়ছে একটি খুটিকে কেন্দ্র করে।
মুহুর্তেই খুজতে থাকি নিজ দেশের পতাকা। বাম দিকের রশি থেকে ২য় রশির উপরে ২য় স্থানে লাগানো আমার দেশের লাল সবুজের পতাকা উড়ছে পত পত করে। দেখেই মনটা ভরে গেলো। মনে হচ্ছিলো নিজ দেশের পতাকাকে ছুয়ে দেখি। ভিনদেশের পতাকার পাশে স্বগৌরবে ঠাই দাড়িয়ে আছে আমার দেশের পতাকা। এটি আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে। (চলবে)

লেখকঃ সম্পাদক, মাসিক ফোকাস বাংলা

LEAVE A REPLY