ওসি প্রদীপ ও তাঁর স্ত্রীর অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদকের অনুসন্ধান

0
13
ওসি প্রদীপ ও তাঁর স্ত্রীর অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদকের অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ওসি প্রদীপ ও তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৮ সালে ওসি প্রদীপের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধ্যান শুরু করলেও মাঝপথে তা থেমে যায়। সম্প্রতি সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খুনের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার পর দুদকে চাপা পড়া সম্পদ অনুসন্ধানের ফাইল আবারও সচল হয়েছে বলে দুদক সুত্রে জানাগেছে।
ইতোপূর্বে ওসি প্রদীপ দুদকে তার বৈধ সম্পদের হিসেব জমা দিলেও বাস্তবতার সাথে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীর ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। ওসি প্রদীপের নামে ও বেনামে এসব সম্পত্তির বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধ্যান প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানা গেছে।
জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে তিনি তার ও স্ত্রী নামে ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকার সম্পদ রয়েছে বলে জানান। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধ্যানে ৩ কোটি ৫৯ লাখর সম্পদের বাইরেও ওসি প্রদীপ ভারত বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়াতে বিপুল সম্পদের মালিক। যার মূল্য দাঁড়াবে বাংলাদেশী টাকায় শত কোটি টাকায়। যা তিনি অবৈধভাবে অর্জন করেছেন।

একাধিক সুত্রে জানাগেছে ওসি প্রদীপ সিএমপির বিভিন্ন থানা ও ককক্সবাজারে কয়েকটি থানাতে থাকাকালে এসব সম্পত্তি অর্জন করে। বিশেষ করে টেকনাফ থানায় ওসি হিসেবে যোগ দিয়ে ইয়াবা কারবারীদের কাছ থেকে এবং বিভিন্ন প্রবাসী ও শিল্পপতিদের ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। গত দুই বছরে সে শুধু টেকনাফ উখিয়া এলাকা থেকে অবৈধভাবে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত কার্যালয় ২ এর উপ পরিচালক মো. মাহবুবুল আলম বলেছেন-ওসি প্রদীপের অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদকের অনুসন্ধ্যান চলছে। যত দ্রুত সম্ভব এর প্রতিবেদন দেয়া হবে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ওসি প্রদীপের চট্টগ্রামের দাশের লাল খান বাজারে একটি ফ্ল্যাট, কক্সবাজারে দুটি হোটেলের মালিকানা, বোয়ালখালীতে স্ত্রী চুমকির নামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ, নগরী পাথরঘাটায় তিনটি বহুতল ভবন। রয়েছে মৎস্য খামার, আগরতলার গৌহাটি ও অষ্ট্রেলিয়ায় তার বাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগও উঠেছে ওসির বিরুদ্ধে। ওসি প্রদীপের আয়কর নথিতে শুধু বেতন ভাতা, শান্তিরক্ষা মিশন থেকে পাওয়া ভাতা ও জিপিএফ থেকে সুদ প্রাপ্ত টাকার বর্ণনা রয়েছে।

ওসি প্রদীপ ও তাঁর স্ত্রীর অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদকের অনুসন্ধান

দুদক জানায়, তার স্ত্রী চুমকি গৃহিণী হলেও ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার মৎস্য খামার তার নামে করা হয়। পাথর ঘাটায় ৪ শতক জমি রয়েছে চুমকির নামে (লক্ষীকুঞ্জ) যার মূল্য ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
ওই জমিসহ ছয়তলা ভবনের বর্তমান মূল্য ১ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার, পাঁচলাইশে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ কোটি ২৯ লাখ ৯২ হাজার ৬০০ টাকার জমি কেনা হয়, ২০১৭-১৮ সালে কেনা হয় কক্সবাজারে ঝিলংজা মৌজায় ৭৪০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট যার দাম ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
সব স্থাবর সম্পদের মূল্য দাঁড়ায় ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা। এছাড়া অস্থাবর সম্পদের ৫ লাখ টাকা দামের প্রাইভেটকার, ১৭ লাখ টাকার মাইক্রোবাস ও ৪৫ ভরি স্বর্ণ। ব্যাংকে ৪৫ হাজার ২০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
তবে বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে পিলে চমকানো সব তথ্য। অনুসন্ধানে দু’জনের নামে দেশ-বিদেশে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যবসাসহ সম্পদের পাহাড় গড়ার তথ্য পেয়েছে দুদক।
এরমধ্যে ভারতের আগরতলার, কলকাতার বারাসাত, গৌহাটি এবং অস্ট্রেলিয়ায় তার একাধিক বাড়ি রয়েছে।। কক্সবাজারে আছে মৎস খামার। চট্টগ্রামে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট ও ব্যবসা। এছাড়া বিদেশে পাচার করেছেন কাড়ি কাড়ি টাকা।
ভারতে সম্পদ কেনার সুবাদে ওসি প্রদীপ ও তার স্ত্রী সন্তান সেখানকার নাগরিকত্ব নিয়েছে বলে বিভিন্ন সুত্রের দাবী।
এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর মুরাদপুরে আপন বোনের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও আছে প্রদীপের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধান শেষ হলে প্রদীপ-দম্পতির আরো অবৈধ সম্পদের খোঁজ মিলবে, বলছেন দুদক কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব চেয়ে ওসি প্রদীপ কুমার দাস ও তার স্ত্রীর কাছে নোটিশ পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই দম্পতি আলাদাভাবে তাদের সম্পদের হিসাব কমিশনে জমা দিয়েছেন।

ওসি প্রদীপ ও তাঁর স্ত্রীর অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদকের অনুসন্ধান

 

দুদকের একজন কর্মকর্তা জানায়, প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অভিযোগ ওঠায় ২০১৮ সালের জুনের মাঝামাঝি প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রদীপ ও তার স্ত্রী চুমকির নামে অস্বাভাবিক সম্পদের তথ্য পান দুদক কর্মকর্তারা। এরপর সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য তাদের চিঠি দেয়া হয়। একই বছরের মে মাসে তারা সম্পদ বিবরণী দুদকে জমা দেন। একই বছরের ১৮ নভেম্বর দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তারা প্রদীপ ও তার স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে প্রতিবেদন ঢাকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠান। তবে ঢাকা কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। ফাইলটি সেখানেই স্তিমিত হয়ে পড়ে। সম্প্রতি প্রদীপ বরখাস্ত হওয়ায় ফাইলটি সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে দুদক।
জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন প্রদীপ। ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পান।
নিউজ৭১/জেএম

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে