স্বাস্থ্য সেবায় বৈশ্বিক সংকট, বাড়ছে অভাব-মরছে মানুষ

– গোলজার আহমদ হেলাল –
সারা দুনিয়া আজ পাবলিক হেলথ ক্রাইসিসের মধ্যে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে হুমকীতে এবং ঝুঁকির সম্মুখীন। প্রাণঘাতি নভেল করোনাভাইরাস জনিত মহামারী রোগ কোভিড-১৯ এর দরুণ আজ অসহায় পৃথিবী, অসহায় মানবতা। করুণ দশায় সাধারণ মানুষ। দেশের লাখ লাখ মানুষ আজ কর্মহীন। বেকারত্বের অভিশাপে অভিযুক্ত (অনেক) বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।

বিভিন্ন দেশে যে জাতীয় সংকট দেখা দিয়েছে তা থেকে আমাদের দেশও মুক্ত নয়। বৈশ্বিক সংকটের আচড় লেগেছে প্রিয় বাংলাদেশে। মানুষের মৌলিক চাহিদা (Basic Needs) অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার দিকে মনোনিবেশ করা এ সময়ের অপরিহার্য দাবী।

বিগত দিনের সাধারণ ছুটি এবং লকডাউনে অর্থনীতি অনেকটাই বিপর্যস্ত। সর্বত্র সাধারণ মানুষের আয় রোজগারে ভাটা পড়েছে। অনেকেই চাকুরী হারিয়েছেন,হারাচ্ছেন।দিনমজুরেরা কাজ পাচ্ছেন না। বেসরকারি সেক্টরে এক ধরনের অস্বস্তি ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা বিরাজ করছে। স্বল্প আয়ের মানুষ বাসা ভাড়া ও খাদ্য সংকটে ঘুচাতে না পেরে গ্রামে পাড়ি জমাচ্ছেন। অপরদিকে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষেরা ঠিকমত কাজ কর্ম না থাকায় অভাবের মধ্যেই দিনাতিপাত করছেন। বাড়ছে পারিবারিক কলহ। হতাশার ঘোর অমানিশার মধ্যে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত সহ গরীব সাধারণ জনগণ। অভাব এবং মরণ দুইটাই ঠায় দুয়ারে দাঁড়িয়ে। সংগত কারণে গ্রাম বাংলার সাধারণ জনগণের জীবনচিত্র দেশের মেইনস্ট্রীম মিডিয়াগুলোতে আসছে না। এমন কি প্রাইভেট সেক্টরের সাথে পেশাজীবী শ্রেণী (শিক্ষক,উকিল,ডাক্তার ইত্যাদি) এবং শ্রমজীবীর অধিকাংশরাই প্রতিকুল অবস্থায় নিপতিত হতে যাচ্ছেন। মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

‘ডাক্তার আসিবার পুর্বে রোগী মারা গেল’-ছোট্টবেলা স্কুলের পাঠে আমরা এই বাক্যটির ইংরেজী অনুবাদ শিখেছি। কবে কখন কোন মনীষী এই বাক্যটি পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করেছেন জানি না। তবে এর মাধ্যমে ক্ষণভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশাই ফুটে উঠেছে। একজন মানুষ সুস্থ থাকা অবস্থায় চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। চিকিৎসা তখনই প্রয়োজন যখন অসুস্থ হয়। সুস্থ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য জনস্বাস্থ্য বিধি প্রতিপালন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কিংবা হেলথ ডিপার্টমেন্ট এ ব্যাপারে চরম উদাসীন। অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসায় যেখানে অনবরত গাফিলতি হয় সেখানে জনস্বাস্থ্য সংকট বা পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস মারাত্মকভাবে আকার ধারণ করে। আমাদের দেশের চিকিৎসকরা রুটিন ডিউটি আর হেলথ কর্মীরা নির্ধারিত প্রজেক্ট ছাড়া অন্য কিছু করে না। বেসরকারী চিকিৎসাকেন্দ্র সমুহে সেবার চেয়ে ব্যবসাই প্রাধান্য পায় বেশী। ক্ষণভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যনীতি এজন্য বহুলাংশে দায়ী।চলমান কোভিড ১৯ এর চিকিৎসা প্রমাণ করল যে আমরা পাবলিক হেলথ্ কতটুকু পিছিয়ে। পাশাপাশি মানুষের মৌলিক চাহিদা চিকিৎসাসেবা আমরা সঠিকভাবে জনগণ কে দিতে পেরেছি কিনা এটাও ভাবার বিষয়।

আমাদের সরকার বেশী আক্তান্ত এলাকায় রেড জোন ঘোষণা করে কার্যত হেলথ ইমার্জেন্সী কিংবা বিজ্ঞানসম্মত লক ডাউনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।সারা দুনিয়া কোভিড ১৯ মোকাবেলায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতার পাশাপাশি লক ডাউন কিংবা হার্ড ইমিউনিটি র যেকোনটি গ্রহণ করে সবাস্থ্যবিধি মেনে চলতে মানুষকে নির্দেশনা দিচ্ছে।তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্র হিসেবে পুরোপুরি লক ডাউন কিংবা লক ডাউন ব্যাতিরেকে শুধুমাত্র ইমিউনিটি গ্রহণের কার্যক্রম নিয়ে অন্তত পক্ষে আমাদের চলা সম্ভব নয়।তাই সীমিত পরিসরে সব কিছু চলবে। এটা একটি ভাল সিদ্ধান্ত। যেখানে দরকার সেখানে শতভাগ কার্যকর লকডাউন হবে। এক্ষেত্রে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার আশংকা থেকে যায়।

আমরা দেখছি এখানে (আমাদের দেশে) বহু সংখ্যক চিকিৎসক আক্রান্ত হচ্ছেন। কেন?
এখানে কি কোন ভুল হচ্ছে। চিকিৎসকরা কি স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে দুর্বলতা করছেন। না নিজের শরীরের প্রতি যত্নশীল হওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে কি?
নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি হচ্ছে। সময়মত রিপোর্ট না পাওয়া, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল ও উপকরণ সংকট, রীতিমত রোগীদের পরিচর্যার ঘাটতি থাকা সত্বেও এগুলোই আমাদের সম্বল।

অপরদিকে সীমিত পরিসরে অফিস আদালত, ব্যাংক বীমা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সিকিভাগ জনবল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কিছুটা হলেও সমস্যা ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জনগণ । সরকারী চাকুরীজীবীদের আর্থিক সমস্যা না হলেও দেশের সিংহভাগ জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যা ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ থাকলেও অভাব ও হতাশা যখন আর্থ সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করবে তখন ঠিকে থাকা হবে মুশকিল।

সুতরাং এই মুহুর্তে পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস মোকাবেলা সবচেয়ে বড় জরুরী। সরকারের সবাস্থ্যবিভাগে প্রয়োজনীয় জনবল চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি পাবলিক হেলথ বিষয়ক ডিগ্রিধারী অথবা ফলিত জীববিজ্ঞান যেমন- জীন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি, বায়োকেমিস্ট্রি, ভাইরোলজি, ব্যাকটেরিওলজি, খাদ্য ও পুষ্ঠি বিজ্ঞানের মত বিভাগের ডিগ্রিধারী লোকজনকে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি করে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়োগ দিতে হবে। জেলা প্রশাসনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (জনস্বাস্থ্য) এমন পদ তৈরী করা যায় কিনা ভাবতে হবে।

কার্যকর লক ডাউন সাধারণ জনমানুষের আয় জীবিকা,উপার্জন,জীবনধারণের উপর আঘাত হানবেই। তাই মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি জীবিকার পথ রক্ষা করতে হবে।উপার্জনের উপায় বের করতে হবে। কিভাবে মানুষ খেয়ে পড়ে বাচতে পারে। সেদিকে নজর দিতে হবে।

লেখকঃ গোলজার আহমদ হেলাল, সহ সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

Read Previous

করোনার দোহাই দিয়ে বিশ্বনাথের পল্লী বিদ্যুতের মনগড়া ভূতুড়ে বিল

Read Next

দক্ষিণ আফ্রিকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ও হৃদরোগে দুই বাংলাদেশীর মৃত্যু

Leave a Reply

Your email address will not be published.