নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি

মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাং নামটা আমাদের বাংলাদেশে যেন রিতীমত এক ভয়ংকর পরিস্থিতিতে রুপ নিচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংদের তান্ডবে এলাকার মানুষগন, সমাজ, দোকানদার, অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা- চট্টগ্রাম, বিভাগীয় ও জেলা শহর এলাকায় কিশোর গ্যাং নামটা খুব পরিচিত। যেই কোন ধরনের মিছিল- মিটিং,মারামারি, মাদক সেবন, চুরি- ডাকাতি,খুনসহ জনগণকে ভয়ভীতি দেখানো সহ সকল বিষয়ের মধ্যে প্রথম স্থানেই কিশোর গ্যাং এ জড়িয়ে পড়ছে আমাদের ছাত্র ও যুব সমাজ।

এবার নির্বাচনে বিভিন্ন ওয়র্ডে কিশোর গ্যাংদের মহা তান্ডব লক্ষ্য করলাম। নাম কিশোর গ্যাং হলেও তাদের কাজ অতি ভয়ংকর। এসব মাদকসেবী কিশোর অপরাধ ঘঠছে শ্রেণি- নির্বিশেষে। দিনমজুর বস্তিবাসীর সন্তান থেকে অভিজাত পরিবারের কিশোরও এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। আগেই বলেছি মাদকের কথা। সুস্পষ্ট কথায়- দল বেঁধে মাদক সেবন থেকে মারামারি, এমনকি হত্যাকান্ড, আর পাড়াই বা মহল্লায় কিশোরী ও তরুনীদের উত্ত্যক্ত করা তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ফলে কখনো দেখা যায় প্রতিক্রিয়ায় উত্ত্যক্ত কিশোরীর আত্মহত্যা। মাদকসেবন কিশোর গ্যাং এ জড়িয়ে যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পড়ালেখা। যেই হাতে থাকার কথা বই,খাতা, কলম কিশোর গ্যাং বা সমাজের কিছু মানুষের দূষিত কোলাহলে সেই হাতে উঠে যায় ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল, অস্ত্র সহ আরো অনেক কিছু। এলাকায় বড় ভাই- ছোট ভাইয়ের তফাৎ বুঝাতে গিয়ে খালি হয় মায়ের কোল। সম্পর্কে ফাটল ধরে পরিবারের সাথে, পড়া লেখার সাথে। জীবনের কি উদ্দেশ্য তাই হারিয়ে ফেলে।

সাধারণত ক্লাস ফাইভ বা সিক্স থেকেই মাদকসেবন কিশোর গ্যাং এ জড়িয়ে আমাদের কোমলমতি আগামী প্রজম্ম। এর দ্বারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অনেক মা- বাবার স্বপ্ন। খালি হচ্ছে আনেক মায়ের কোল। ছাত্র- ও যুব সমাজকে এই রাস্তার আনার জন্য দায়ী কিছু অশুভ নেতা, পারিবারিক শাসন ও মায়া-মমতা,শিক্ষা, লাইকি সহ আরো অনেক কিছু। এদের ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছেন কিছু কুচক্রী মহল। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় গিয়ে নষ্ট হয়ে যাবে আমাদের পুরো ছাত্র ও যুব সমাজ। এর থেকে প্রতিকার পেতে হলে পরিবার, স্কুল-কলেজ থেকেই এই শিক্ষা দিতে হবে। রাজনীতির মঞ্চ থেকেও বলতে হবে উচ্চ আওয়াজে। ছাত্র সমাজ যদি নষ্ট না হয় তৈরি হবে ভালো নেতা। তৈরি হবে ভালো শিক্ষক। তৈরি হবে ভালো সমাজ ব্যবস্থা।

পরিবার মাদকসেবন ও কিশোর গ্যাং রুখতে পারবে কিভাবে? আপনার সস্তান কি করছে? কার সঙ্গে মিশছে, তা জানা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সন্তানকে সময় দেওয়া, তার সঙ্গে গল্প করা, তার মনের অবস্থা বোঝা, তার কছে বাবা- মায়ের অবস্থান তুলে ধরা। আরও সহজভাবে বলতে গেলে, অভিভাকদের সঙ্গে সন্তানের বন্ধন খুবই জরুরী। এই বন্ধন যত হালকা হবে, সন্তান তত বাইরের দিকে ছুটবে, তখন আর তাকে ফেরানোর কোনও রাস্তা থাকবে না। শিক্ষায়তনের অভিভাবক তথা শিক্ষকদেরও দায়িত্ব আছে, যদিও অল্প, তবুও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীরা কী করছে সেদিকে লক্ষ্য রাখার দায় অবশ্যই শিক্ষকদের। প্রহার নয়, শাস্তি নয়, সন্তানতুল্য মায়া-মমতা ও দরদ দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়েই পথভ্রষ্টদের সঠিক পথে নিয়ে আসার দায়িত্ব শিক্ষকদের।

প্রশাসনের এর আইনের মাধ্যমেও নির্মুল করা যেতে পারে কিশোর গ্যাংকে। কিশোর গ্যাং এর মাধ্যমে ঘটে যাওয়া ছোট অপরাধ সহ বড় অপরাধকেও ছাড় না দিয়ে শক্ত হাতে তার বিচার করা। সঠিক বিচার হলেও বন্ধো হতে পারে কিশোর গ্যাং এর নোংরা অপরাধ। যে কোন ধরনের রাজনীতি দল থেকেও যদি ১০ থেকে ২০ বছরের যুবকদেও ব্যবহার করা না হয় শতকরা ৯০% ছাত্র ও যুুবকরা মাদকসেবন ও কিশোর গ্যাং এ পরিণত হবে না। তৈরি করার সাহস সঞ্চায় হবে না। যদি তৈরি হয়েও যায় প্রশাসন আইনের মাধ্যমে সঠিক বিচার করতে সক্ষম হবে।

মাদকসেবন কিশোর অপরাধ কমিয়ে নির্মুল করা সম্ভব আমাদের সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে। এরজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সরকারের ও প্রশাসনের সহযোগিতার পাশাপাশি আমাদের সদিচ্ছারও প্রয়োজন। ঘর থেকে শুরু করে স্কুল,কলেজ সব জায়গায় কিশোরদের মন মস্তিস্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে। সামাজ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, ফুটবল, ক্রিকেট খেলা থেকে শুরু করে নাচ- গান বাদ্যযন্ত্র শেখানো, আবৃত্তি, গল্প বলা, গল্প বানানো, শব্দের খেলা, শারীরিক শিক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে। শিশু কিশোরদের মোবাইল হাতে না দিয়ে বই পড়ার,পাঠাগাড়ে যাওয়ার, লেখালেখি করা, উদ্যোক্তা করে গড়ে উঠার স্বপ্ন দেখাতে হবে। উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের নিয়ে মঞ্চ নাটক, পথনাটকসহ সব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সহ বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত থাকে, যদি তার মন মস্তিস্ক জায়গা বুঝে তাকে গড়ে তুলা হয়, তবে তার কৈশোর ভালো কাটবে, আর কৈশোর ভালো কাটলে তার তারুণ্য হবে সবচেয়ে ফরপ্রসূ। এভাবে সুদীর্ঘ পরিকল্পনার মাধদিয়ে কিশোরদের আলাদা করে গড়ে তুলতে হবে, তবেই কিশোর অপরাধ কমে যাবে। না হয় উত্তপ্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে যেখানে সেখানে, যেখানে আর আমাদের কিশোরদের শক্তি হারিয়ে যাবে অতলে।

ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে মেয়েরা পড়া লেখায় যেভাবে উত্তীর্ণ হচ্ছে পাশাপাশী তারা উদ্যোক্তাও হচ্ছে। আমাদের উচিৎ এখন থেকেই মেয়েদের পাশাপাশি ছাত্র ও যুবদের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং তাদের গড়ে তুলা। এর দ্বারা বন্ধ হবে মাদকসেবন ও কিশোর গ্যাং। নষ্ট হবে না আমাদের ছাত্র ও যুব সমাজ, নষ্ট হবে না কোন মায়ের কোল বা স্বপ্ন। এর প্রতিদান হিসেবে উন্নত হবে সমাজ, উন্নত হবে বাংলাদেশ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে